Loading...

যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল, নিমতিতা ‘রাজবাড়ি’র জলসাঘরের সানাইয়ে আজও জেগে আছে দেবী দুর্গা

  • admin

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:১৮

আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিমতিতা ‘রাজবাড়ি’ শুধু একটা রাজবাড়ি নয়, এ এক ইতিহাসের দলিল। মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের নিমতিতা রাজবাড়ির ইট, কাঠ, ধুলোয় আজও লেগে আছে সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি।

ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে জানা যায়, ১৮৫৫ সাল নাগাদ গৌরসুন্দর চৌধুরী ও দ্বারকানাথ চৌধুরীর উদ্যোগে শুরু হয় নিমতিতা জমিদার বাড়ির নির্মাণ কাজ। ইতালিয়ান স্থাপত্য অনুসারে প্রায় ১০ বিঘা জমির উপর নির্মিত এই জমিদারবাড়িতে ছিল পাঁচটি উঠোন এবং ১৫০টি ঘর। জমিদারবাড়ির বিশাল আকার এবং আয়তনের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে তা ‘রাজবাড়ি’ হিসেবেই পরিচিতি লাভ করে। এক সময় মুর্শিদাবাদ জেলার সব থেকে বড় জাঁকজমক পূর্ণ দুর্গাপুজো এই ‘রাজবাড়ি’তেই অনুষ্ঠিত হতো বলে জানা যায়। এর পাশাপাশি চৌধুরী পরিবারের সুখ্যাতি গোটা দেশ জুড়ে ছিল হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের প্রতি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য। ইতিহাসবিদরা দাবি করেন, এই জমিদার বাড়িতেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ‘হিন্দু থিয়েটার রঙ্গমঞ্চের’। রাজবাড়ির নাট্য মঞ্চে অভিনয় করে গিয়েছেন শিশিরকুমার ভাদুড়ির মত নাট্যকার।

ADVERTISEMENT

গৌরসুন্দর চৌধুরী এবং দ্বারকানাথ চৌধুরীর হাতে তৈরি এই ‘রাজবাড়ি’ আজও বাঙালির কাছে এক আবেগের নাম। কারণ, এই বাড়িই সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’, ‘দেবী’ এবং ‘সমাপ্তি’র মতো কালজয়ী ছবির পটভূমি। যে ঝাড়লণ্ঠনের নীচে ছবি বিশ্বাস জলসা বসিয়েছিলেন, যে উঠোনে অপর্ণা সেন ‘সমাপ্তি’র শেষ দৃশ্যে ছুটে গিয়েছিলেন, সেই উঠোন, সেই থাম আজও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

আরও পড়ুন

এখানকার দুর্গাপুজো একসময় রাজকীয় জাঁকজমকের জন্য বিখ্যাত ছিল। লোকমুখে শোনা যায়, পুজোর সময় ১০১ জন ঢাকি একসঙ্গে ঢাক বাজাতেন। পাঁচ দিন ধরে গ্রামের হাজার হাজার মানুষের জন্য চলত পাত পেড়ে খাওয়ানো। কালের নিয়মে আজ সেই ‘রাজবাড়ি’ ভগ্নপ্রায়। ইট-চুন খসে পড়েছে, দরজা-জানালায় ধরেছে ঘুণ। কিন্তু যা আজও অটুট আছে, তা হল এখানকার দুর্গাপুজো। প্রায় ৩৫০ বছরের পুরনো এই পুজো আজও বন্ধ হয়নি। কলকাতা থেকে প্রতি বছর ছুটে আসেন রায়বাহাদুর জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী এবং মহেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর নাতি-নাতনিরা অর্থাৎ এই বংশের চতুর্থ প্রজন্ম। তাঁরাই আজও সমস্ত রীতিনীতি মেনে এই পুজো চালিয়ে যাচ্ছেন।

পুজোটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হল একচালার প্রতিমা। আজও বংশপরম্পরায় সেই একই কুমোর পরিবার এসে প্রতিমা গড়েন। শুধু প্রতিমাই নয়, যে পুরোহিত পরিবার প্রথম এই পুজো শুরু করেছিলেন, আজও তাঁরই উত্তরসূরিরা এই পুজো করে আসছেন। আরও একটি অদ্ভুত প্রথা আজও মেনে চলা হয়। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম থেকেই এই ‘রাজবাড়ি’র পুজোর সমস্ত আয়োজন করতেন নাপিতরা। সেই প্রথা মেনে আজও পুজোর সমস্ত জোগাড় নাপিতদের মাধ্যমেই করা হয়। চৌধুরী পরিবারের কোনও সদস্য সরাসরি পুজোর আয়োজনে হাত দেন না।

পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের সদস্য মধুছন্দা চৌধুরী বলেন, “আমাদের পুজো বৈষ্ণব মতে হয়, তাই এখানে কোনও বলি প্রথা নেই। এমনকি মাকে অন্নভোগও দেওয়া হয় না। মায়ের ভোগে থাকে লুচি, নানা ধরনের ভাজা, মিষ্টি। আর সবটাই হয় নুন ছাড়া। এটাই আমাদের নিয়ম।” তিনি আরও জানান, “পঞ্চমীর দিন দেবীকে ‘থানে’ তোলা হয়। তারপর ষষ্ঠীতে বোধন, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীতে নিয়ম মেনে পুজো, আরতি হয়। দশমীর দিনেই প্রতিমার বিসর্জন হয়।”

বর্তমানে পরিবারের সকলেই কলকাতায় থাকলেও পুজোর ওই ক'টা দিন তাঁরা নিমতিতাতেই থাকার চেষ্টা করেন। মধুছন্দা দেবী বলেন, “শারীরিক অসুস্থতার জন্য যদি কখনও পুজোতে যেতে না পারি, তাহলে ‘ভিডিও কলে’ মায়ের সামনে অঞ্জলি দিই। কারণ নিমতিতা ‘রাজবাড়ি’র দুর্গাপ্রতিমা শুধু আমাদের কাছে নয়, গোটা এলাকাবাসীর কাছে আজও জাগ্রত।”

পুজোর ক’টা দিন হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান এই ‘রাজবাড়ি’তে। শুধু পাত পেড়ে খাওয়া বা ‘রাজবাড়ি’ দেখার টানে নয়, একটা আবেগের টানে। সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি আর ৩৫০ বছরের ঐতিহ্যকে একবার ছুঁয়ে দেখার টানে। ২০২২ সালে এই ‘রাজবাড়ি’কে ‘হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও, সরকারি সংরক্ষণের কাজ আজও নিয়মের বেড়াজালে আটকে রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই ঐতিহাসিক বাড়িটিকে সংরক্ষণ করা হোক, না হলে ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল হারিয়ে যাবে।

ADVERTISEMENT